শ্রীকৃষ্ণ জন্মাষ্টমীতে কি কি করা উচিৎ ? ও উচিৎ নয় ?

 


🌸 আজ জন্মাষ্টমী — এই শুভ দিনে কী করবেন, আর কী করবেন না? 🌸

আজ পবিত্র জন্মাষ্টমী। এই দিনেই ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব হয়েছিল বলে সনাতন ধর্মে এই তিথির বিশেষ মাহাত্ম্য রয়েছে।

এই বছর জন্মাষ্টমীর দিনটি আরও বিশেষ বলে মনে করা হচ্ছে। কৃত্তিকা ও রোহিণী নক্ষত্রের পাশাপাশি সর্বার্থ সিদ্ধি যোগ এবং অমৃত সিদ্ধি যোগ-এর উপস্থিতিকেও অত্যন্ত শুভ বলে জ্যোতিষশাস্ত্রে বিবেচনা করা হয়।

তাই এই পবিত্র দিনে কিছু নিয়ম মেনে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আরাধনা করলে মন শান্ত হয় এবং তাঁর কৃপা লাভের প্রার্থনা করা যায়।

🦚 জন্মাষ্টমীর দিনে যা করতে পারেন

১. লাড্ডু গোপালের পূজা করুন

জন্মাষ্টমীর দিনে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শিশু রূপ অর্থাৎ লাড্ডু গোপালের পূজা করা অত্যন্ত শুভ বলে মনে করা হয়। ভক্তিভরে তাঁর পূজা করে নিজের মনের ইচ্ছা প্রার্থনা করতে পারেন।

২. সামর্থ্য অনুযায়ী উপবাস রাখুন

অনেক ভক্ত জন্মাষ্টমীর দিন সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত উপবাস পালন করেন এবং শ্রীকৃষ্ণের জন্মের পর প্রসাদ গ্রহণ করেন। কেউ নির্জলা উপবাস করেন, আবার কেউ ফলাহার করেন।

তবে শিশু, বৃদ্ধ, অসুস্থ ব্যক্তি এবং যাঁদের শারীরিক কারণে উপবাস করা সম্ভব নয়, তাঁদের জোর করে উপবাস করা উচিত নয়। ভক্তির মূল কথা শরীরকে কষ্ট দেওয়া নয়।

৩. কৃষ্ণের নামস্মরণ ও কীর্তন করুন

দিনভর “হরে কৃষ্ণ, হরে রাম”, “ওঁ নমো ভগবতে বাসুদেবায়” ইত্যাদি নামস্মরণ, ভজন, কীর্তন ও শ্রীমদ্ভাগবত পাঠ করা শুভ বলে মনে করা হয়।

৪. কৃষ্ণের পূজা করুন

বাড়ি বা মন্দিরে শ্রীকৃষ্ণের প্রতিমা বা ছবি ফুল, ফল, তুলসীপাতা, দুধ, মধু, মাখন ও মিষ্টি দিয়ে সাজিয়ে পূজা করতে পারেন।

৫. মধ্যরাতে কৃষ্ণের জন্মক্ষণ পালন করুন

রাত ১২টার সময় শঙ্খ ও ঘণ্টাধ্বনি দিয়ে আরতি করুন। কৃষ্ণের শিশুরূপকে দোলনায় বসিয়ে ঝুলন বা দোলনা দোলানোর রীতিও প্রচলিত রয়েছে।

৬. কৃষ্ণের প্রিয় ভোগ নিবেদন করুন

দুধ, দই, মাখন, মিষ্টি, ক্ষীর, ফল ইত্যাদি দিয়ে নৈবেদ্য সাজিয়ে ভগবানকে নিবেদন করতে পারেন। পরে তা প্রসাদ হিসেবে গ্রহণ করুন।

৭. দান করুন

এই শুভ দিনে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী দরিদ্র ও অসহায় মানুষকে খাবার, পোশাক, জল বা প্রয়োজনীয় সামগ্রী দান করা অত্যন্ত পুণ্যের কাজ বলে মনে করা হয়।

৮. কৃষ্ণ ও বলরামের উদ্দেশ্যে রাখি নিবেদন

কিছু লোকাচার ও ভক্তিমূলক বিশ্বাস অনুযায়ী জন্মাষ্টমীর দিনে কৃষ্ণ ও বলরামের হাতে রাখি নিবেদন করা শুভ। বিশ্বাস করা হয়, এতে ভগবানের আশীর্বাদ ও সুরক্ষার প্রার্থনা করা যায়।

৯. রূপোর বাঁশি রাখতে পারেন

লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, জন্মাষ্টমীর দিনে একটি ছোট রূপোর বাঁশি কৃষ্ণের চরণে নিবেদন করে পরে পুজোর জায়গায় বা নিজের কাছে রাখা শুভ বলে মনে করা হয়। অনেকেই এটিকে সৌভাগ্য ও সমৃদ্ধির প্রতীক হিসেবে মানেন।

১০. গরু বা বাছুরের প্রতীকী মূর্তি রাখতে পারেন

জন্মাষ্টমীর দিনে রূপো, পিতল বা মাটির তৈরি গরু-বাছুরের মূর্তি ঘরে রাখা অনেকের কাছে শুভ বলে বিবেচিত। কৃষ্ণের সঙ্গে গরুর গভীর সম্পর্কের কারণে এটি ভক্তি ও সমৃদ্ধির প্রতীক হিসেবেও দেখা হয়।


🚫 জন্মাষ্টমীর দিনে যা এড়িয়ে চলবেন

১. অপরিচ্ছন্ন অবস্থায় পূজা করবেন না

পূজার আগে স্নান করে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পোশাক পরা ভালো। পবিত্রতা ও শুদ্ধতার দিকে বিশেষ নজর দেওয়া উচিত।

২. রাগ, ঝগড়া ও অশান্তি এড়িয়ে চলুন

এই পবিত্র দিনে রাগ, হিংসা, তর্ক, কাউকে অপমান করা, মিথ্যা কথা বলা ইত্যাদি থেকে দূরে থাকা উচিত।

৩. মাংস ও মদ্যপান থেকে বিরত থাকুন

জন্মাষ্টমীর দিনে অনেক ভক্ত সাত্ত্বিক জীবনযাপন করেন। তাই মাংস, মদ ও আমিষ খাবার এড়িয়ে চলার রীতি রয়েছে।

৪. উপবাস করলে শস্যজাত খাবার এড়িয়ে চলুন

যাঁরা ব্রত বা উপবাস পালন করেন, তাঁরা সাধারণত চাল, গমসহ শস্যজাত খাবার এড়িয়ে ফল, দুধ, দই, মাখন, মিষ্টি বা অনুমোদিত উপবাসের খাবার গ্রহণ করেন।

৫. ঠাকুরঘর অপরিচ্ছন্ন রাখবেন না

পূজার ঘরে জুতো, নোংরা কাপড় বা অন্য কোনও অপবিত্র জিনিস রাখা উচিত নয়।

৬. ঠাকুরঘরে বাসি ফুল রাখবেন না

জন্মাষ্টমীর মতো বিশেষ পূজার দিনে বাসি বা শুকিয়ে যাওয়া ফুল সরিয়ে তাজা ফুল দিয়ে পূজা করা ভালো।

৭. পূজায় স্টিলের প্রদীপ ব্যবহার না করাই ভালো

অনেক প্রচলিত আচার অনুযায়ী পূজার প্রদীপ হিসেবে পিতল, কাঁসা, তামা বা মাটির প্রদীপ ব্যবহার করা হয়। তাই সম্ভব হলে স্টিলের প্রদীপ এড়িয়ে চলতে পারেন।

৮. দেরি করে ঘুম থেকে উঠবেন না

বাড়িতে জন্মাষ্টমীর পূজা থাকলে সকালেই উঠে স্নান করে পরিষ্কার পোশাক পরে পূজার প্রস্তুতি নেওয়া ভালো। সামর্থ্য থাকলে পবিত্র নদী বা গঙ্গায় স্নানও করতে পারেন।

৯. ব্রহ্মচর্য পালন করুন

জন্মাষ্টমীর ব্রত পালনকারীদের জন্য এই দিনে ব্রহ্মচর্য পালন করা অনেক আচার-অনুষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়। বিশেষ করে যাঁদের বাড়িতে গোপালের পূজা ও ব্রত রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে স্বামী-স্ত্রীর শারীরিক সম্পর্ক থেকে বিরত থেকে দিনটি ভক্তি, সংযম ও আধ্যাত্মিক সাধনায় কাটানোর রীতি রয়েছে।

🙏 মনে রাখবেন

জন্মাষ্টমীর আসল মাহাত্ম্য শুধু নিয়ম-কানুন পালনে নয়, ভক্তি, সংযম, পবিত্রতা এবং ভালোবাসার সঙ্গে শ্রীকৃষ্ণকে স্মরণ করার মধ্যে।

তাই নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী উপবাস, পূজা, নামস্মরণ, কীর্তন ও দান করুন।

শ্রীকৃষ্ণের চরণে প্রার্থনা করি—সকলের জীবন সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধিতে ভরে উঠুক।

🦚 হরে কৃষ্ণ। হরে রাম।
জয় শ্রীকৃষ্ণ।
🙏