দুরন্ত " ফুলু "র আবিস্কারের কাহিনী - পড়ুন আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের জীবনী
আজ বাঙালির বিজ্ঞানচর্চা, শিল্পোদ্যোগ ও আত্মনির্ভরতার অন্যতম পথিকৃৎ আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়-এর জন্মতিথি।
শুধু একজন বিশ্বমানের রসায়নবিদ হিসেবে নয়—প্রফুল্ল চন্দ্র রায় ছিলেন একাধারে যুগান্তকারী শিক্ষক, দরদী সমাজসেবক, দূরদর্শী উদ্যোক্তা এবং এক খাঁটি দেশপ্রেমিক। তাঁর জীবনের পরতে পরতে ছড়িয়ে রয়েছে এমন কিছু ঘটনা, যা আজও আমাদের নতুন করে পথ দেখায়।
🧪 বিজ্ঞানের আবিষ্কার থেকে আত্মনির্ভর ভারত
১৮৯৬ সালে মাত্র ৩৫ বছর বয়সে প্রেসিডেন্সি কলেজের ছোট্ট ল্যাবরেটরিতে তিনি আবিষ্কার করেন 'মারকিউরাস নাইট্রেট' ($Hg_2(NO_3)_2$), যা আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানমঞ্চে বাঙালিকে এক অনন্য পরিচয় দেয়।
তবে কেবল ল্যাবরেটরির চারদেওয়ালেই তিনি আটকে থাকেননি। আজ আমরা যে 'মেড ইন ইন্ডিয়া' বা 'আত্মনির্ভর ভারত'-এর কথা শুনি, প্রফুল্ল চন্দ্র রায় তার স্বপ্ন দেখেছিলেন একশো বছরেরও আগে! মাত্র ৭০০ টাকা মূলধন নিয়ে তিনি গড়ে তুলেছিলেন ভারতের প্রথম ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি 'বেঙ্গল কেমিক্যাল অ্যান্ড ফার্মাসিউটিক্যাল ওয়ার্কস'। উদ্দেশ্য ছিল একটাই—তৎকালীন ভারতীয় যুবকদের দাসত্বের চাকরিপ্রার্থী না বানিয়ে স্বয়ংসম্পূর্ণ চাকরিদাতা হিসেবে গড়ে তোলা।
🌳 শৈশবের দুরন্তপনা ও জমানো টাকার মহাদান
শৈশবে ডাকনাম ছিল 'ফুলু'। ছোটবেলায় খুলনা জেলার রাড়ূলী গ্রামে পড়ার সময় খুব একটা বাধ্য শান্ত শিশু ছিলেন না তিনি। মাঝেমধ্যেই স্কুল পালিয়ে নদীর ধারে কোনো উঁচু গাছের ডালে, পাতার আড়ালে গিয়ে বসে থাকতেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা—গোপনে বই পড়ার নেশায়!
পরবর্তী জীবনে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর হিসেবে বিশাল অঙ্কের বেতন পেলেও, নিজের জীবনযাত্রায় ছিলেন চরম একনিষ্ঠ ও প্রথাবিরোধী।
কলা কেনার গল্প: একবার এক দুস্থ ছাত্র সাহায্যের জন্য এলে, পকেটে বড় নোট থাকায় তিনি ফল বিক্রেতার কাছ থেকে দু'পয়সার কলা কিনে নোট ভাঙান! তারপর কলাগুলো ছাত্রটিকে খেতে দিয়ে বাকি পুরো টাকাটাই তার হাতে তুলে দেন।
দু'আনা অপচয়ে রাগ ও নারী শিক্ষায় দান: প্রতিদিনের হিসেব মেলাতে গিয়ে একবার এক শিষ্য বাজারে দু'আনা পয়সা বেশি খরচ করায় তাঁকে কড়া বকা দেন আচার্য। অথচ, তার কিছুদিন পরই নারী শিক্ষার প্রসারে ব্রাহ্ম বালিকা শিক্ষালয়ে নিজের ব্যাংকে জমানো সমস্ত সম্বল ও জীবনের উপার্জিত বিপুল অর্থ নিঃসংকোচে দান করে দেন!
যে মানুষটি নিজের জন্য একটি পয়সার অপচয় সহ্য করতেন না, তিনিই আবার সমাজের কল্যাণে নিজের সর্বস্ব বিলিয়ে দিতেন।
💡 "ছাত্রদের কাছে পরাজিত হতেই আমার আনন্দ"
শিক্ষক হিসেবে তিনি ছিলেন পরম শ্রদ্ধেয়। তাঁর বিখ্যাত উক্তি:
"সর্বত্র জয় অন্বেষণ করিবে, কিন্তু পুত্র ও শিষ্যের নিকট পরাজয় স্বীকার করিয়া আনন্দিত হইবে।"
মেঘনাদ সাহা, সত্যেন্দ্রনাথ বসু, জ্ঞানচন্দ্র ঘোষের মতো বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানীরা তাঁরই হাত ধরে তৈরি হয়েছিলেন। জাতীয় বিজ্ঞান দিবসে যেমন ভারতের বৈজ্ঞানিক ঐতিহ্যকে স্মরণ করা হয়, তেমনই "ভারতীয় রসায়ন শাস্ত্রের জনক" প্রফুল্ল চন্দ্র রায়কে ছাড়া বাঙালির বিজ্ঞানচর্চার ইতিহাস অসম্পূর্ণ।
আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের মূল খ্যাতি 'মারকিউরাস নাইট্রেট' আবিষ্কার এবং বেঙ্গল কেমিক্যালের জন্য হলেও, রসায়ন বিজ্ঞানে তাঁর অবদান ছিল অত্যন্ত বিস্তৃত ও বৈচিত্র্যময়।
তৎকালীন সময়ে সীমিত সুযোগ-সুবিধায় প্রেসিডেন্সি কলেজ ও পরবর্তীতে সায়েন্স কলেজের ল্যাবরেটরিতে বসে তিনি বিশ্বমানের গবেষণা চালিয়েছিলেন। তাঁর প্রধান বৈজ্ঞানিক অবদানগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:
১. নাইট্রাইট যৌগের বিস্তৃত গবেষণা (Chemistry of Nitrites)
মারকিউরাস নাইট্রেট ($Hg_2(NO_3)_2$) আবিষ্কারের পর তিনি ক্ষারীয় মৃত্তিকা (Alkaline earth metals) ও অন্যান্য ধাতুর নাইট্রেট ও নাইট্রাইট যৌগ নিয়ে গভীর গবেষণা শুরু করেন।
তিনি অ্যামোনিয়াম নাইট্রাইট ($NH_4NO_2$) নামক একটি অত্যন্ত অস্থিতিশীল (unstable) যৌগকে বিশুদ্ধ ও স্ফটিক আকারে (crystalline form) তৈরি করতে সক্ষম হন। এর আগে বিজ্ঞানীরা মনে করতেন অ্যামোনিয়াম নাইট্রাইট তৈরি করা প্রায় অসম্ভব, কারণ এটি সহজে ভেঙে নাইট্রোজেন ও জলে পরিণত হয়।
তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে বিশুদ্ধ অবস্থায় অ্যামোনিয়াম নাইট্রাইট বাষ্পীভূত হতে পারে না ভেঙে গিয়ে। তাঁর এই গবেষণা আন্তর্জাতিক রাসায়নিক সমাজে ব্যাপক আলোড়ন ফেলেছিল।
২. সালফার ও মারকারি যৌগ (Organo-metallic Compounds)
তিনি জৈব-ধাতব রাসায়নিক যৌগ (Organometallic compounds) এবং বিশেষ করে সালফার (গন্ধক) ও পারদ (Mercury) সমন্বিত যৌগের উপর মৌলিক গবেষণা করেন।
বিভিন্ন জৈব থাইও-যৌগ (Thio-compounds) ও প্ল্যাটিনাম, সোনার মতো ধাতুর সাথে তাদের জটিল বন্ধন (Complexes) নিয়ে তাঁর একাধিক গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছিল লন্ডনের বিখ্যাত Chemical Society Journal-এ।
৩. ভারতীয় রসায়ন শাস্ত্রের ইতিহাস (History of Hindu Chemistry)
বিজ্ঞানকে কেবল ল্যাবরেটরিতে বন্দি না রেখে, তিনি প্রাচীন ভারতে বিজ্ঞানের ঐতিহ্য খুঁজে বের করার জন্য বছরের পর বছর গবেষণা করেন।
১৯০২ এবং ১৯০৯ সালে তিনি দুই খণ্ডে প্রকাশ করেন তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ: "A History of Hindu Chemistry"।
এই বইটির জন্য তিনি সংস্কৃত এবং অন্যান্য প্রাচীন পুথি ও পাঠ্য (যেমন: চরক সংহিতা, সুশ্রুত সংহিতা, রসরত্নসমুচ্চয়) অধ্যয়ন করেন। তিনি বিশ্বকে প্রমাণ করে দেখান যে ইউরোপীয়দের অনেক আগেই প্রাচীন ভারতে রসায়ন, ধাতুবিদ্যা (Metallurgy) ও ঔষধ তৈরির প্রযুক্তি অত্যন্ত উন্নত ছিল।
৪. ১৪৮টিরও বেশি গবেষণাপত্র ও রয়্যাল সোসাইটি
তিনি জীবনের কর্মজীবনে ১৪৮টিরও বেশি মৌলিক গবেষণাপত্র (Research Papers) প্রকাশ করেছিলেন, যা তৎকালীন বিশ্বখ্যাত ব্রিটিশ ও আন্তর্জাতিক জার্নালগুলোতে সমাদৃত হয়।
রসায়ন বিজ্ঞানে তাঁর অসাধারণ অবদানের জন্য বিশ্ববিখ্যাত বৈজ্ঞানিক সংস্থাগুলো তাঁকে সর্বোচ্চ সম্মান জানায়:
ব্রিটেনের রয়্যাল সোসাইটি অব কেমিস্ট্রি (Royal Society of Chemistry) তাঁকে সম্মান জানিয়ে Chemical Landmark Award প্রদান করে (যা ইউরোপের বাইরে প্রথম কোনো বিজ্ঞানী হিসেবে তিনি পান)।
লন্ডনের বিখ্যাত কেমিস্ট স্যার উইলিয়াম রামসে (Sir William Ramsay) তাঁর গবেষণা সম্পর্কে লিখেছিলেন: "প্রফুল্ল চন্দ্র রায় যে ধরনের যৌগ আবিষ্কার করেছেন, তা রসায়ন শাস্ত্রের বইতে নতুন অধ্যায় যোগ করেছে।"
🔬 সংক্ষেপে তাঁর বিজ্ঞান সাধনা:
আচার্য রায় কেবল নিজে নতুন রাসায়নিক যৌগ আবিষ্কার করেই থেমে থাকেননি; ভারতে "ইন্ডিয়ান স্কুল অব কেমিস্ট্রি" (Indian School of Chemistry) প্রতিষ্ঠা করে তিনি এমন এক বিজ্ঞানী গোষ্ঠী তৈরি করেছিলেন, যারা পরবর্তীকালে স্বাধীন ভারতের বিজ্ঞান গবেষণার ভিত শক্ত করেছিলেন।
🔍 কেন আজকের বাঙালির এই মহান মানুষকে মনে রাখা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন?
আজকের যুগে দাঁড়িয়ে প্রফুল্ল চন্দ্র রায় কেবল একটি ঐতিহাসিক নাম নন, তিনি বাঙালির ঘুরে দাঁড়ানোর সবচেয়ে বড় প্রেরণা।
১. বাঙালির ব্যবসায়িক মানসিকতা গঠন: বাঙালি কেবল 'চাকরিজীবী'—এই অপবাদ ভেঙে তিনি দেখিয়েছিলেন কীভাবে শূন্য থেকে শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হয়। বেঙ্গল কেমিক্যাল গড়ে তিনি প্রমাণ করেছিলেন, বিজ্ঞানের জ্ঞানকে দেশের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে কাজে লাগানো সম্ভব।
২. অপচয় রোধ ও ত্যাগ: আধুনিক ভোগবাদী সমাজে যেখানে অপচয় আর প্রদর্শন প্রধান হয়ে উঠেছে, সেখানে আচার্য রায়ের সাদামাটা জীবন ও সমাজের প্রতি নিঃস্বার্থ ত্যাগ আমাদের বিনম্র হতে শেখায়।
৩. বিজ্ঞানমনস্কতা ও আত্মবিশ্বাস: পরাধীন ভারতের বুকে দাঁড়িয়েও বিশ্বমঞ্চে বিজ্ঞানের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে তিনি প্রমাণ করেছিলেন, সদিচ্ছা ও নিষ্ঠা থাকলে যেকোনো প্রতিকূল পরিবেশেই সেরা গবেষণা সম্ভব।
আজকের এই বিশেষ দিনে এই মহান দূরদর্শী বিজ্ঞানীকে জানাই আমাদের পরম শ্রদ্ধা ও প্রণাম। তাঁর আদর্শ ও আত্মনির্ভরতার চেতনা বেঁচে থাকুক আমাদের প্রতিটি কর্মে! 🙏✨
