ট্রেনে অতিরিক্ত লাগেজ নিয়ে ভ্রমণ: ভারতীয় রেলের ব্যাগেজ রুলস ও কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা

ট্রেনে যাতায়াতের সময় আমরা প্রায় সবাই একটা সাধারণ সমস্যার মুখে পড়েছি—লাগেজ রাখার জায়গা না পাওয়া। বিশেষ করে স্লিপার বা ৩-টার্ড এসি (3AC) কোচে অনেক যাত্রীই পরিবারের বিশাল বিশাল ব্যাগ, বড় ট্রাঙ্ক কিংবা অতিরিক্ত ভারী মালপত্র নিয়ে উঠে পড়েন। ফলে সিটের নিচে বা আশেপাশে বিন্দুমাত্র হাঁটাচলার জায়গা থাকে না। নিজের একটি ছোট ব্যাগ রাখার জন্যও সহযাত্রীদের সঙ্গে তর্কাতর্কি কিংবা চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়। এই ভেতরের বিশৃঙ্খলা সামলাতে এবং যাত্রীদের যাতায়াত আরো আরামদায়ক করতে ভারতীয় রেল এখন থেকে কোচে অতিরিক্ত মালপত্র তোলার বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিচ্ছে।


ব্যাগেজ লিমিট: কোন ক্লাসে কত কেজি সাথে রাখা যাবে?

কোচের শ্রেণী (Class of Travel) অনুযায়ী বিনামূল্যে সর্বোচ্চ কত কেজি লাগেজ আপনি নিজের সাথে কামরায় নিতে পারবেন, তা নিচে দেওয়া হলো:

  • ফার্স্ট এসি (First AC): সর্বোচ্চ ৭০ কেজি ফ্রি।

  • সেকেন্ড এসি (Second AC): সর্বোচ্চ ৫০ কেজি ফ্রি।

  • থার্ড এসি / চেয়ার কার (3AC / CC): সর্বোচ্চ ৪০ কেজি ফ্রি।

  • স্লিপার ক্লাস (Sleeper Class): সর্বোচ্চ ৪০ কেজি ফ্রি।

  • সাধারণ শ্রেণী (General / Second Class): সর্বোচ্চ ৩৫ কেজি ফ্রি।

জরুরি বিষয়: ব্যাগের ওজনের পাশাপাশি আকারের ওপরও নজর দেওয়া হচ্ছে। ব্যাগ যদি অতিমাত্রায় বড় হয় এবং সিটের নিচের খালি জায়গায় ফিট না হয়, তবে ওজন সীমার মধ্যে থাকলেও তা কোচে নিয়ে যাওয়া যাবে না। অতিরিক্ত মালপত্র থাকলে যাত্রার আগেই তা রেল পার্সেল ভ্যানে বুকিং করে দেওয়া উচিত।


এটি প্রতি যাত্রীর (প্রতি টিকিটধারীর) জন্য প্রযোজ্য, পুরো PNR-এর জন্য নয়।

উদাহরণ:

  • একটি PNR-এ ৪ জন যাত্রী (Sleeper Class) থাকলে
    • প্রত্যেকে বিনামূল্যে ৪০ কেজি করে লাগেজ বহন করতে পারবেন।
    • অর্থাৎ মোট ১৬০ কেজি পর্যন্ত ফ্রি অ্যালাউন্স (৪০ × ৪)।
  • একটি PNR-এ ২ জন AC 2 Tier যাত্রী থাকলে
    • প্রত্যেকে ৫০ কেজি করে বহন করতে পারবেন।
    • মোট ১০০ কেজি ফ্রি অ্যালাউন্স।

তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নিয়মটি প্রতি যাত্রীর ব্যক্তিগত লাগেজ ভাতা হিসেবে লেখা হয়েছে। বাস্তবে TTE বা রেলকর্মীরা সাধারণত দলের মোট লাগেজ হিসেবেও বিবেচনা করতে পারেন যদি সবাই একই সঙ্গে ভ্রমণ করেন। কিন্তু অফিসিয়াল নিয়মে ভাতা প্রতি যাত্রী হিসেবেই নির্ধারিত।

 

আসল সত্য: এই নিয়ম কি সম্পূর্ণ নতুন?

অনেকের মনেই প্রশ্ন আসছে যে এটি কি একদম নতুন কোনো আইন? উত্তর হলো: না।

ভারতীয় রেলের লাগেজ সংক্রান্ত এই নিয়ম বহু বছর আগে থেকেই আইন খাতায় লেখা ছিল। এতদিন পর্যন্ত এই নিয়ম কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হতো না বললেই চলে। কিন্তু বর্তমানে ট্রেনের ভিড় বৃদ্ধি এবং কামরার ভেতর চলাচলের পথ সুগম রাখতে রেলওয়ে বোর্ড এই পুরনো নিয়মকেই নতুন করে কড়াকড়িভাবে স্টেশনে স্টেশনে চালু করছে। এয়ারপোর্টের মতো প্রধান প্রধান রেল স্টেশনেও এখন ব্যাগের ওজন মাপা ও চেকিং ড্রাইভ বাড়ানো হচ্ছে। 


পশ্চিমবঙ্গে কি চালু হয়ে গেছে ? 

পশ্চিমবঙ্গসহ পুরো পূর্ব রেলে (Eastern Railway) এবং দক্ষিণ পূর্ব রেলে (South Eastern Railway) আলাদা করে কোনো নতুন আইন জারি করা হয়নি, বরং ভারতীয় রেলের কেন্দ্রীয় নির্দেশনা অনুযায়ী হাওড়া (Howrah), শিয়ালদহ (Sealdah), আসানসোল (Asansol), ও নিউ জলপাইগুড়ি (NJP)-র মতো বড় ও গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনগুলোতে রেল পুলিশ ও চেকিং স্টাফরা নিয়মিত ‘স্পেশাল ড্রাইভ’ বা বিশেষ নজরদারি অভিযান চালাচ্ছেন।

১. হাওড়া ও শিয়ালদহ স্টেশন: দূরপাল্লার গুরুত্বপূর্ণ ট্রেনগুলোর (যেমন রাজধানী, দুরন্ত বা অন্যান্য এক্সপ্রেস ট্রেন) প্ল্যাটফর্মে ওঠার মুখে কিংবা স্ক্যানার পয়েন্টগুলোতে আরপিএফ (RPF) এবং টিকিট পরীক্ষকরা (TTE) অস্বাভাবিক বড় বা অতিরিক্ত ভারী ব্যাগ দেখলে সতর্ক করছেন। ওজনে অতিরিক্ত মনে হলে যাত্রীদের নির্ধারিত পার্সেল কাউন্টারে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে।

২. আগে থেকে নিয়ম থাকলেও বাস্তবায়নে পার্থক্য: বাস্তবে বিমান স্টেশনের মতো প্রতিটি যাত্রীর ব্যাগ মেপে টিকিট কাটার স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা সাধারণ ট্রেন স্টেশনগুলোতে এখনো পুরোপুরি বসানো সম্ভব হয়নি। তবে ট্রেনের কামরার ভিড় কমাতে ও সহযাত্রীদের নিরাপত্তার স্বার্থে টিটিই (TTE)-রা ট্রেনের ভেতরেও অতিরিক্ত ওজনের ব্যাগের বিরুদ্ধে চেকিং চালাচ্ছেন।


নিয়ম কড়াকড়িতে কিছু মানুষের যে সমস্ত সমস্যা হতে পারে

এই সিদ্ধান্ত সাধারণ যাত্রীদের যাত্রাপথ সুগম করলেও কিছু ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের সমস্যা ও উদ্বেগের কারণ হতে পারে:

১. মধ্যবিত্ত ও বড় পরিবারের চাপ: আমাদের দেশে অনেক সময় পুরো পরিবার নিয়ে দূরে বা দীর্ঘদিনের জন্য ঘুরতে যাওয়ার সময় কিংবা বাড়ি বদল/কাজের সূত্রে শিফট করার সময় ব্যাগের সংখ্যা বেশি হয়। এয়ারপোর্টের মতো কড়াকড়ি হলে মধ্যবিত্ত পরিবারের খরচ অনেকটাই বেড়ে যাবে।

২. হয়রানি ও স্টেশনে সময় নষ্ট: ট্রেনে ওঠার আগে স্টেশনে যদি ব্যাগের ওজন মেপে ঢোকানো বাধ্যতামূলক হয়, তবে বড় বড় স্টেশনের ভিড়ে দীর্ঘ লাইন পড়বে এবং ট্রেন ধরার হুড়োহুড়িতে যাত্রীদের হয়রানি হতে পারে।

৩. ছোট ব্যবসায়ী ও পরিযায়ী শ্রমিক: অনেক ছোট ব্যবসায়ী বা কাজের তাগিদে যাতায়াত করা সাধারণ মানুষ ট্রেনেই তাদের মালামাল বহন করেন। অতিরিক্ত চার্জের দরুন তাঁদের ওপর আর্থিক চাপ সৃষ্টি হবে।

তথ্যের উৎস (Information Source)

এই তথ্য ও নিয়ম সংক্রান্ত বিবরণী ভারতীয় রেলের অফিশিয়াল ওয়েবসাইট এবং প্রাসঙ্গিক পোর্টাল থেকে সংগৃহীত। অফিশিয়াল নির্দেশিকা দেখতে নিচের লিঙ্কগুলোতে ক্লিক করতে পারেন: