জীবদ্দশায় ছাপা হয়নি কোনো বই - আদিকবি ভানুভক্ত আচার্য

নেপালি সাহিত্যের আদিকবি ভানুভক্ত আচার্য (১৮১৪-১৮৬৮) সাহিত্যিক অবদান ও জীবনকৃতি

আদিকবি ভানুভক্ত আচার্য: নেপালি ভাষার প্রাণপুরুষ ও তাঁর জীবনের কিছু অজানা অধ্যায়

আজ আমরা এমন এক ব্যক্তিত্বকে নিয়ে আলোচনা করব, যাঁকে ছাড়া নেপালি সাহিত্যের ইতিহাস সম্পূর্ণ অসম্ভব। তিনি আদিকবি ভানুভক্ত আচার্য। ১৮১৪ সালের ১৩ জুলাই (মতান্তরে ২৯ আষাঢ়) তানাহু জেলার রামহাতে জন্ম নেওয়া এই মানুষটি সাধারণ মানুষের মুখের ভাষাকে সাহিত্যের মূল ধারায় এনে এক ঐতিহাসিক বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন। ভানুভক্ত আচার্যের পিতার নাম ছিল ধনঞ্জয় আচার্য এবং মাতার নাম ছিল ধর্মাগতী দেবী (কারো মতে রূপাবতী দেবী)। তাঁর পিতা ধনঞ্জয় আচার্য একজন সরকারি কর্মচারী (সরকারি আমলা) ছিলেন।

রামায়ণের সহজ অনুবাদ ও ভাষাগত ঐক্য

ভানুভক্তের সবচেয়ে বড় কীর্তি হলো সংস্কৃত অধ্যাত্ম রামায়ণের নেপালি অনুবাদ। তাঁর সমসাময়িক যুগে সাহিত্য এবং ধর্মগ্রন্থ ছিল মূলত সংস্কৃত নির্ভর, যা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে ছিল। ভানুভক্ত প্রথমবার ললিত এবং সহজ নেপালি ছন্দে রামের গল্প সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেন। তাঁর এই কাজের ফলে নেপালি ভাষা একটি শক্তিশালী রূপ পায় এবং বিভিন্ন উপজাতি ও গোষ্ঠীর মধ্যে ভাষাগত ঐক্যের সৃষ্টি হয়। এই কারণেই তাঁকে 'আদিকবি' উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

কিছু কম জানা এবং আকর্ষণীয় তথ্য (Lesser-Known Facts)

১. এক ঘাসুড়ের (ঘাস বিক্রেতা) থেকে জীবনের সবচেয়ে বড় প্রেরণা:

ভানুভক্তের কবি হয়ে ওঠার পেছনে এক সাধারণ মানুষের অবদান ছিল। তরুণ বয়সে একদিন এক ঘাস কাটার লোকের (ঘাসুড়ে) সাথে তাঁর দেখা হয়। সেই দরিদ্র মানুষটি ঘাস বিক্রি করে জমানো টাকা দিয়ে পথচারীদের তৃষ্ণা মেটানোর জন্য একটি কুয়ো খুঁড়ছিলেন, যাতে মৃত্যুর পরেও মানুষ তাঁকে মনে রাখে। এই ঘটনা ভানুভক্তের মনে গভীর দাগ কাটে। তিনি ভাবলেন, একজন সাধারণ দরিদ্র মানুষ যদি সমাজের জন্য এত বড় চিন্তা করতে পারে, তবে তিনি নিজে কী করছেন? এই আত্মোপলব্ধি থেকেই তিনি কবিতা লেখা শুরু করেন।

২. কারাগারের বন্দিদশা এবং সাহিত্য সৃষ্টি:

অনেকেই জানেন না যে, ভানুভক্তকে জীবনের একটা বড় সময় সরকারি হিসাবের গরমিল এবং দুর্নীতির মিথ্যা অভিযোগে কাঠমান্ডুর কুমারীচকের কারাগারে কাটাতে হয়েছিল। কিন্তু এই বন্দিদশাও তাঁর সাহিত্য সাধনা থামাতে পারেনি। জেলে বসেই তিনি তাঁর অন্যতম বিখ্যাত কৃতি ‘ভক্তমালা’, ‘প্রশ্নোত্তর’ এবং ‘রামায়ণ’-এর অযোধ্যা, অরণ্য, কিষ্কিন্ধা ও সুন্দর কাণ্ড রচনা করেছিলেন।

৩. সরকারি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কবিতার মাধ্যমে প্রতিবাদ:

জেলে থাকার সময় তাঁর মামলার কোনো শুনানি হচ্ছিল না। বিচার পাওয়ার আশায় এবং তৎকালীন ধীরগতির বিচার ব্যবস্থার প্রতিবাদে তিনি সরাসরি দেশের প্রধান (রানা প্রধানমন্ত্রী) কে লক্ষ্য করে একটি শ্লেষাত্মক কবিতা লিখে বসেন। কবিতার ভাষা এতটাই চতুর ও ধারালো ছিল যে, তা পড়ে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী মুগ্ধ হন এবং ভানুভক্তকে মুক্তি দেওয়ার পাশাপাশি পুরস্কৃত করেন।

৪. জীবদ্দশায় কোনো বই প্রকাশিত হয়নি:

ভানুভক্ত তাঁর জীবদ্দশায় অত্যন্ত জনপ্রিয় হলেও, তাঁর কোনো বই তাঁর বেঁচে থাকতে ছাপা বা প্রকাশিত হয়নি। তিনি মূলত পাণ্ডুলিপি আকারে লিখতেন এবং তা মানুষ মুখে মুখে গাইত। তাঁর মৃত্যুর প্রায় দুই দশক পর, ১৮৮৪ সালে বিখ্যাত পণ্ডিত ও সাহিত্যিক মতিরাম ভট্ট তাঁর পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ করে বারাণসী থেকে প্রথমবার ভানুভক্তের ‘রামায়ণ’ বই আকারে প্রকাশ করেন। মতিরাম ভট্টই ভানুভক্তের প্রথম জীবনী লেখেন এবং তাঁকে আলোর সামনে নিয়ে আসেন।

৫. ভারতের সাথে সংযোগ ও ‘ভানু জয়ন্তী’:

ভানুভক্ত শুধু নেপালের নন, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল (বিশেষ করে দার্জিলিং, কালিম্পং, সিকিম ও আসাম) যেখানে বিপুল সংখ্যক নেপালি ভাষী মানুষ বাস করেন, সেখানেও সমানভাবে পূজিত। প্রতি বছর ১৩ জুলাই ভারত ও নেপাল জুড়ে অত্যন্ত মর্যাদার সাথে 'ভানু জয়ন্তী' পালন করা হয়, যা এই দুই দেশের সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনের একটি বড় প্রতীক।

উপসংহার

ভানুভক্ত আচার্য কেবল একজন অনুবাদক বা কবি ছিলেন না, তিনি ছিলেন সমাজ সংস্কারক। সমাজ যখন জাতিভেদ এবং কঠিন নিয়মে বন্দী ছিল, তখন তিনি সাধারণ মানুষের ভাষাকে মর্যাদা দিয়ে এক অনন্য সাংস্কৃতিক বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন। তাঁর লেখনী আজও কোটি কোটি মানুষের মনে বেঁচে রয়েছে।