পশ্চিমবঙ্গ দিবস (২০ জুন) উপলক্ষে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী বক্তৃতা

পশ্চিমবঙ্গ দিবস: আমাদের অস্তিত্ব, আমাদের আত্মমর্যাদা ও বাঙালির পুনরুত্থান



শ্রদ্ধেয় সভাপতি মহাশয়, মঞ্চে উপবিষ্ট শ্রদ্ধেয় গুণীজন এবং আমার সামনে উপস্থিত দেশের ভবিষ্যৎ—আমার প্রিয় ভাই ও বোনেরা,

আজ ২০শে জুন। ক্যালেন্ডারের পাতায় ঘেরা কোনো সাধারণ ছুটির দিন বা নিছক একটা তারিখ আজ নয়। আজকের দিনটি আমাদের বুকের রক্ত দিয়ে কেনা দিন। আজ পশ্চিমবঙ্গ দিবস। আজ আমাদের অস্তিত্বের লড়াইয়ের দিন, আমাদের শিকড়ের সন্ধান করার দিন।

প্রথমে জানাই ঐতিহাসিক বঙ্গভঙ্গ-এর কথা - তৎকালীন ভারতের ব্রিটিশ বড়লাট (Viceroy) লর্ড কার্জন প্রশাসনিক সুবিধার অজুহাত দেখিয়ে ১৯০৫ সালের ১৬ই অক্টোবর বাংলাকে বিভাজন করলেও, এর মূল উদ্দেশ্য ছিল তীব্র হতে থাকা ভারতীয় জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে দুর্বল করা এবং হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভেদ তৈরি করা । এই বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে সারা বাংলায় তীব্র গণ-আন্দোলন ও 'স্বদেশী আন্দোলন' শুরু হয়। অবশেষে প্রবল গণ-অতিরোধের মুখে পড়ে ব্রিটিশ সরকার ১৯১১ সালের ১২ই ডিসেম্বর দিল্লির দরবারে বঙ্গভঙ্গ রদ (বাতিল) করার ঘোষণা দিতে বাধ্য হয় এবং বাংলা আবার একত্রিত হয়।

তার পর ১৯৪৭ সাল , স্বাধীনতার বছর ।  আজ থেকে ঠিক উনআশি বছর আগে, ১৯৪৭ সালের এই ২০শে জুন, বঙ্গীয় আইনসভার ঐতিহাসিক অধিবেশনে সিদ্ধান্ত হয়েছিল—লাখো লাখো বাঙালির সুরক্ষার জন্য, আমাদের সংস্কৃতি, আমাদের ধর্ম এবং আমাদের আত্মপরিচয় টিকিয়ে রাখার জন্য স্বাধীন ভারতের বুকে জন্ম নেবে এক টুকরো পুণ্যভূমি, যার নাম ‘পশ্চিমবঙ্গ’।

সেদিন স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের সুযোগ্য পুত্র ডক্টর শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের মতো দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ক এবং বাংলার তৎকালীন মনীষীরা নিজের জীবন বাজি রেখে রুখে না দাঁড়াতেন, তবে আজ হয়তো ভারতের মানচিত্রে এই পশ্চিমবঙ্গ নামক কোনো ভূখণ্ডের অস্তিত্বই থাকত না। পুরো বাংলাই হয়ত পাকিস্তান হয়ে যেত।  আমরা আজ যেখানে দাঁড়িয়ে স্বাধীন বাতাসে নিশ্বাস নিচ্ছি, স্বাধীন ভাষায় কথা বলছি—তা হয়তো কোনো এক অন্ধকারের অতলে হারিয়ে যেত। তাই পশ্চিমবঙ্গ দিবস কোনো সাধারণ উৎসব নয়, এটি বাঙালির বুক চিতিয়ে লড়াই করার এবং অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার এক চিরন্তন মহাকাব্য।

আমার প্রিয় সুধী, একবার চোখ বন্ধ করে ভাবুন, আমরা কোন মাটির সন্তান? এই বাংলা শুধু একটা ভৌগোলিক সীমানা নয়, এই বাংলা হলো পরম ব্রহ্মের লীলাভূমি! আধ্যাত্মিকতার যে জোয়ার এই বাংলার মাটি থেকে উঠে সারা বিশ্বকে প্লাবিত করেছে, তার কোনো তুলনা ইতিহাসের পাতায় নেই।

আমরা সেই মাটির সন্তান, যেখানে স্বয়ং মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যদেব আবির্ভূত হয়েছিলেন। যিনি জাতি-ধর্ম-বর্ণের ভেদাভেদ চূর্ণ-বিচূর্ণ করে কেবল ‘হরেকৃষ্ণ’ নামের শক্তিতে কোটি কোটি মানুষের হৃদয় জয় করেছিলেন, যিনি শিখিয়েছিলেন প্রেমের চেয়ে বড় কোনো ধর্ম নেই।

আমরা গর্বিত, কারণ এই বাংলার মাটি থেকেই উঠে এসেছিলেন যোগিরাজ শ্যামাচরণ লাহিড়ী মহাশয়। যাঁর ‘ক্রিয়াযোগ’ আজ সারা বিশ্বের মানুষকে অন্তরের আলো দেখাচ্ছে, জীবনের পরম সত্যের সন্ধান দিচ্ছে।

আমরা সেই বাংলার সন্তান, যেখানে জন্ম নিয়েছিলেন ইসকনের প্রতিষ্ঠাতা শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ। এই বাঙালি মহাপুরুষ জলপথের এক সাধারণ মালবাহী জাহাজে চড়ে, শূন্য পকেটে, কেবল বুকে শ্রীকৃষ্ণের নাম আর বাংলার আধ্যাত্মিক সম্পদ নিয়ে পাড়ি দিয়েছিলেন সুদূর আমেরিকায়। আজ সাত সমুদ্র তেরো নদী পার হয়ে বিশ্বজুড়ে যে ‘হরে কৃষ্ণ’ মহামন্ত্র গুঞ্জরিত হচ্ছে, সাহেব-মেমরা যেভাবে ধুতি-শাড়ি পরে বাঙালি বৈষ্ণব ভাবধারায় নিজেদের সমর্পণ করছে—তা এই বাংলার এক জাঁদরেল বাঙালির আধ্যাত্মিক বিপ্লবের ফসল!

এই ভুমিতেই জন্ম শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব, শ্রী অরবিন্দ, মা সারদা,  ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, কাজী নজরুল ইসলাম , সত্যজিৎ রায় , রাজা রামমোহন রায়  —এবং যার নামে সারা পৃথিবী আমাদের ভারতকে চেনে সেই যুগপুরুষ স্বামী বিবেকানন্দের । 

কার নাম নেব আর কার নাম ছাড়ব? গভীর সংস্কৃতি ও আধ্যাত্মিকতার এই যে আকাশছোঁয়া ঐতিহ্য, তা কেবল এই বাংলার মাটিতেই সম্ভব।

"হাজার বছর ধরে ভারত যখনই সংকটে পড়েছে, বাঙালীর আধ্যাত্মিক শক্তিই আমাদের ঘুরে দাঁড়ানোর সাহস জুগিয়েছে।"

বিজ্ঞানের অগ্রদূত: বিশ্বকে পথ দেখানো বাঙালি

আমার প্রিয় ভাই ও বোনেরা, বাংলা শুধু অন্তর্জগতের আলো দেখায়নি, বহির্জগতকে চেনার চোখও দিয়েছে। বিজ্ঞান সাধনায় বাঙালি যে উচ্চতা স্পর্শ করেছে, তা আজ বিশ্বমঞ্চ মাথা নত করে স্বীকার করে।

  • আমরা সেই আচার্য জগদীশচন্দ্র বসুর উত্তরাধিকারী, যিনি বিশ্বকে প্রথম প্রমাণ করে দেখিয়েছিলেন যে উদ্ভিদেরও প্রাণ আছে, তারাও আমাদের মতো সুখে হাসে আর দুঃখে কাঁদে।

  • আমরা সেই আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের বংশধর, যিনি ভারতীয় রসায়ন শাস্ত্রের জনক এবং যিনি পরমুখাপেক্ষী না হয়ে নিজের দক্ষতায় ‘বেঙ্গল কেমিক্যালস’ গড়ে তুলে তদানিন্তন যুবসমাজকে স্বনির্ভরতার পথ দেখিয়েছিলেন।

  • আমরা গর্বিত সেই সত্যেন্দ্রনাথ বসুর জন্য, যাঁর নামের সাথে জড়িয়ে আছে আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের ‘বোসন’ কণা। আইনস্টাইনের মতো বিশ্বসেরা বিজ্ঞানী যাঁর মেধার কদর করেছিলেন!

এই বিজ্ঞানীদের মেধা আর সাধনা প্রমাণ করে যে, বাঙালি ঘরে বসে শুধু ভাবালুতায় ভোগে না, বাঙালি ল্যাবরেটরিতে বসে মহাবিশ্বের রহস্য উন্মোচন করতেও জানে।

 আমাদের শপথ

আজকের এই পবিত্র দিনে আমাদের মনে রাখতে হবে, ঋষি বঙ্কিমচন্দ্রের যে ‘বন্দে মাতরম’ মন্ত্র গোটা ভারতকে পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙতে উদ্বুদ্ধ করেছিল, তা এই বাংলার মাটিতেই রচিত হয়েছিল। 

নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর যে ‘জয় হিন্দ’ স্লোগান আজ প্রতিটি ভারতীয়র ধমনীতে রক্ত প্রবাহ বাড়িয়ে দেয়, তা এক বাঙালিরই কণ্ঠের হুঙ্কার ছিল। ক্ষুদিরাম বসু, প্রফুল্ল চাকী, বাঘা যতীন, মাস্টারদা সূর্য সেন, মাতঙ্গিনী হাজরার মতো শত শত শহীদের রক্তে রাঙানো আমাদের এই পবিত্র পশ্চিমবঙ্গ।

কিন্তু আজ, ২০শে জুনের এই আলোয় দাঁড়িয়ে আমাদের নিজেদের একটা প্রশ্ন করতে হবে—আমরা কি আমাদের সেই গৌরব ধরে রাখতে পারছি? আজ কেন আমাদের যুবসমাজকে কর্মসংস্থানের জন্য ভিন রাজ্যে পাড়ি দিতে হবে? আজ কেন আমাদের গৌরবময় ভাষা ও সংস্কৃতি অবহেলার শিকার হবে?

জাতীয়তাবাদ মানে শুধু মুখে স্লোগান দেওয়া নয়। আসল জাতীয়তাবাদ হলো নিজের রাজ্যকে ভালোবাসা, নিজের রাজ্যের কৃষ্টি ও ঐতিহ্যকে রক্ষা করা এবং পশ্চিমবঙ্গকে আবার শিক্ষা, সংস্কৃতি, বিজ্ঞান ও শিল্পের শীর্ষে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া।

আসুন, আজ এই পশ্চিমবঙ্গ দিবসে আমরা সবাই মিলে বুকে হাত দিয়ে প্রতিজ্ঞা করি— 

১. আমরা আমাদের মনীষীদের দেখানো পথ ভুলব না। 

২. আমরা আমাদের কৃষ্টি, বিজ্ঞানমনস্কতা এবং আধ্যাত্মিক মূল্যবোধকে আমাদের জীবনে ফিরিয়ে আনব। 

৩. কোনো রাজনৈতিক বিভেদ বা সংকীর্ণ স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে, আমরা ‘বাঙালি’ হিসেবে এবং সর্বাগ্রে ‘ভারতীয়’ হিসেবে এই পশ্চিমবঙ্গকে দেশের সেরা রাজ্য হিসেবে গড়ে তুলব।

আসুন, কবিগুরুর সেই পবিত্র প্রার্থনাকে আজ আমাদের কণ্ঠের আওয়াজ বানিয়ে দিই:

"বাংলার মাটি বাংলার জল, বাংলার বায়ু বাংলার ফল— পুণ্য হউক, পুণ্য হউক, পুণ্য হউক হে ভগবান।"

আসুন, আরেকবার বুক ফুলিয়ে, গর্জে উঠে বলি—আমাদের পশ্চিমবঙ্গ দীর্ঘজীবী হোক! আমাদের ঐতিহ্য অমর হোক!

বন্দে মাতরম! ভারত মাতার জয়! জয় হিন্দ!