ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম - হারিয়ে যাওয়া 'হুল দিবসের' ইতিহাস জেনে নিন
স্মরণ ও শ্রদ্ধায়: হুল দিবস (৩০শে জুন)
"১৮৫৭-র সিপাহী বিদ্রোহের আগেই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল সাঁওতাল হুল।"
আজ ৩০শে জুন। ভারতের মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাসে এক রক্তক্ষয়ী, অভূতপূর্ব এবং গৌরবময় দিন—'হুল দিবস'। সাঁওতালি ভাষায় ‘হুল’ শব্দের অর্থ হলো বিদ্রোহ বা মহাবিপ্লব। ১৮৫৫ সালের এই দিনে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ, অত্যাচারী জমিদার এবং সুদখোর মহাজনদের শোষণের বিরুদ্ধে এক সর্বাত্মক গণ-আন্দোলনে গর্জে উঠেছিল বীর সাঁওতাল সমাজ।
✊ ১৮৫৭-র আগেই জ্বলে উঠেছিল বিদ্রোহের আগুন
আমরা অনেকেই ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম বলতে ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের কথা ভাবি। কিন্তু তার ঠিক দুই বছর আগে, ১৮৫৫ সালেই বাংলার বুকে জ্বলে উঠেছিল ব্রিটিশ বিরোধী প্রথম সুসংগঠিত গণ-বিদ্রোহের আগুন, যা ‘সাঁওতাল হুল’ নামে পরিচিত। সিপাহী বিদ্রোহের অনেক আগেই সিধু-কানহুর নেতৃত্বাধীন এই আন্দোলন প্রমাণ করে দিয়েছিল যে, সাধারণ মানুষ ঐক্যবদ্ধ হলে তৎকালীন বিশ্বের সবচেয়ে বড় শক্তিকেও চ্যালেঞ্জ করা সম্ভব।
🏹 কেন ফেটে পড়েছিল এই অসন্তোষ?
ইংরেজরা চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত চালুর পর সাঁওতালদের নিজেদের কঠোর পরিশ্রমে গড়ে তোলা ফসলি জমির ওপর চড়া হারে খাজনা চাপায়। একই সাথে ‘দিকু’ বা বহিরাগত মহাজন ও জমিদারদের প্রবেশ ঘটে। এই মহাজনেরা সরল-সোজা সাঁওতালদের ঋণের জালে ফাঁসাimport করত এবং তাঁদের জঙ্গল ও জমি কেড়ে নিত। এমনকি সাঁওতাল নারীদের ওপর চলত চরম নির্যাতন। এই দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া পরিস্থিতি থেকেই জন্ম নেয় পুঞ্জীভূত ক্ষোভ।
১৮৫৫ সালের ৩০শে জুন বর্তমান ঝাড়খণ্ডের সাহেবগঞ্জ জেলার ভোগনাডিহি গ্রামে প্রায় ৪০০টি গ্রামের প্রায় ৩০,০০০ সাঁওতাল মানুষ তির-ধনুক, টাঙ্গি নিয়ে সমবেত হন। সিধু ও কানহু মুর্মু ঘোষণা করেন, তাঁরা আর কোনো কর দেবেন না এবং শোষণমুক্ত স্বাধীন ‘সাঁওতাল রাজ্য’ প্রতিষ্ঠা করবেন।
🚨 ইংরেজদের নৃশংস অত্যাচার ও দমনপীড়ন
সাঁওতালদের অদম্য বীরত্বের কাছে শুরুতে ব্রিটিশ বাহিনী একের পর এক যুদ্ধে হেরে যেতে থাকে। বিদ্রোহীরা বহু জমিদার বাড়ি ও রেল স্টেশন ধ্বংস করে দেয়। বেগতিক দেখে ব্রিটিশ সরকার এলাকায় মার্শাল ল (সামরিক আইন) জারি করে।
ইংরেজরা এই আন্দোলন দমনে যে নৃশংসতা চালিয়েছিল, তা মানব ইতিহাসের অন্যতম কালো অধ্যায়:
আধুনিক বন্দুক, কামান এবং ব্রিটিশ সেনাদের প্রশিক্ষিত হাতির দলের সামনে সাঁওতালদের ঐতিহ্যবাহী তির-ধনুক টিকতে পারেনি।
নির্বিচারে পুড়িয়ে দেওয়া হয় একের পর এক সাঁওতাল গ্রাম।
নারী, শিশু নির্বিশেষে নির্বিচারে গণহত্যা চালানো হয়। ইতিহাসবিদদের মতে, এই দমনে প্রায় ১৫,০০০ থেকে ২০,০০০ সাঁওতালকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছিল।
🕯️ কীভাবে শেষ হলো এই আন্দোলন?
চরম বীরত্বের সাথে লড়াই করলেও শেষ পর্যন্ত বিশ্বাসঘাতকতা এবং আধুনিক অস্ত্রের কাছে আন্দোলন পিছু হটতে বাধ্য হয়। ১. যুদ্ধের ময়দানে বীরত্বের সাথে লড়াই করতে করতে শহীদ হন চাঁদ ও ভৈরব। ২. তাঁদের দুই বোন, ফুলো ও ঝানো মুর্মু ছদ্মবেশে শত্রু শিবিরে ঢুকে ব্রিটিশ সেনাদের ওপর আক্রমণ চালান এবং পরবর্তীতে শহীদ হন। ৩. অবশেষে আন্দোলনের মূল দুই স্তম্ভ সিধু ও কানহুকে ব্রিটিশরা বন্দি করে এবং অত্যন্ত নৃশংসভাবে ভোগনাডিহি গ্রামেই গাছের ডালে ঝুলিয়ে ফাঁসি দেওয়া হয়। নেতাদের মৃত্যুর পর ১৮৫৬ সালের গোড়ার দিকে এই আন্দোলন স্তিমিত হয়ে পড়ে।
📈 এই আন্দোলনের সুদূরপ্রসারী প্রভাব
সাঁওতালরা যুদ্ধে হারলেও তাঁদের নৈতিক জয় হয়েছিল। ব্রিটিশরা বুঝতে পেরেছিল যে আদিবাসীদের অধিকার কেড়ে নিয়ে শান্তি বজায় রাখা অসম্ভব। ফলে বাধ্য হয়ে ইংরেজ সরকার আইন সংশোধন করে এবং:
আদিবাসীদের সুরক্ষায় ‘সাঁওতাল পরগনা’ (Santhal Parganas) নামক একটি পৃথক জেলা গঠন করে।
বিশেষ আইন পাশ করে নিয়ম করা হয় যে, আদিবাসীদের জমি কোনো অ-আদিবাসীর কাছে হস্তান্তর বা বিক্রি করা যাবে না।
আজকের এই বিশেষ দিনে পশ্চিমবঙ্গের সমস্ত আদিবাসী ভাই-বোন এবং বীর শহীদদের জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা। তাঁদের জল-জঙ্গল-জমির লড়াই এবং আত্মমর্যাদার অধিকার রক্ষার আন্দোলন আজ ও আগামীকালের প্রতিটি অধিকার রক্ষার লড়াইয়ের মূল প্রেরণা।
সবাইকে হুল দিবসের বিপ্লবী শুভেচ্ছা! হুল জোহার! 🏹✊
সাঁওতাল হুল বা সাঁওতাল বিদ্রোহের ইতিহাসে বীর পুরুষদের পাশাপাশি সাঁওতাল নারীদের অবদানও ছিল অপরিসীম। আর সেই নারীশক্তির অবিকল্প দুই প্রতীক হলেন ফুলো মুর্মু এবং ঝানো মুর্মু। তাঁরা ছিলেন বিদ্রোহের প্রধান দুই পুরোধা—সিধু, কানহু, চাঁদ ও ভৈরবের সহোদর বোন।
১৮৫৫ সালের এই মহাবিদ্রোহে তাঁরা কেবল পুরুষদের ঘরের কোণে বসে সাহায্য করেননি, বরং নিজেরা অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিলেন এবং সরাসরি শত্রু শিবিরে হানা দিয়ে ব্রিটিশদের মনে ত্রাস সৃষ্টি করেছিলেন। নিচে তাঁদের বীরত্ব ও গৌরবময় ইতিহাসের বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
✊ বিদ্রোহের প্রেক্ষাপট ও নারীদের সংগঠিত করা
সাঁওতালদের ওপর ব্রিটিশ পুলিশ, জমিদার এবং বহিরাগত ‘দিকু’ মহাজনদের যে চরম অত্যাচার চলত, তার বড় শিকার হতেন সাঁওতাল নারীরা। তাঁদের সম্মানহানি এবং শারীরিক নির্যাতন ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। এই চরম অপমানের প্রতিশোধ নিতে এবং নিজেদের অধিকার রক্ষা করতে ফুলো ও ঝানো মুর্মু এগিয়ে আসেন।
নারী বাহিনী গঠন: সিধু-কানহু যখন পুরুষদের সংগঠিত করছিলেন, তখন ফুলো ও ঝানো গ্রামে গ্রামে ঘুরে সাঁওতাল নারীদের একত্রিত করেন। তাঁরা নারীদের বোঝাতে সক্ষম হন যে, জমি এবং আত্মসম্মান বাঁচাতে তাঁদেরও ঘরের বাইরে আসতে হবে।
গোয়েন্দা ও রসদ সরবরাহ: যুদ্ধের শুরুতে ফুলো ও ঝানো মুর্মুর নেতৃত্বে সাঁওতাল নারীরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁরা ছদ্মবেশে ব্রিটিশ সেনাদের ছাউনির আশেপাশে ঘুরে তথ্য সংগ্রহ করতেন (গোয়েন্দাগিরি) এবং গোপনে সাঁওতাল যোদ্ধাদের কাছে তীর, ধনুক, কুঠার ও খাবার পৌঁছে দিতেন।
⚔️ সম্মুখ সমরে বীরত্ব: শত্রু শিবিরে হানা
হুল আন্দোলনের তীব্রতা যখন বাড়তে থাকে, তখন ফুলো এবং ঝানো সরাসরি রণক্ষেত্রে নেমে পড়েন। ইতিহাস এবং লোকগাথা অনুযায়ী, তাঁদের বীরত্বের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর এবং রক্তক্ষয়ী অধ্যায়টি ঘটেছিল একটি ব্রিটিশ সেনা ক্যাম্প বা ছাউনিতে।
ছদ্মবেশী আক্রমণ: একদিন রাতে ফুলো ও ঝানো মুর্মু সাঁওতাল নারীদের একটি দল নিয়ে সাধারণ গ্রামীণ নারীর ছদ্মবেশে ব্রিটিশ সেনাদের একটি ক্যাম্পে প্রবেশ করেন। তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল শত্রু সেনার অসতর্কতার সুযোগ নেওয়া।
২১ জন ব্রিটিশ সেনাকে নিধন: গভীর রাতে যখন ব্রিটিশ সেনারা মদ্যপ বা ঘুমন্ত অবস্থায় ছিল, তখন ফুলো ও ঝানো নিজেদের কাছে লুকিয়ে রাখা টাঙ্গি (কুঠার) এবং ধারালো অস্ত্র বের করে আচমকা আক্রমণ চালিয়ে দেন। লোকগাথা এবং কিছু ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী, সেই রাতে তাঁরা দুই বোন মিলে একক সাহসে প্রায় ২১ জন ব্রিটিশ সেনাকে খতম করেছিলেন। এই আকস্মিক ও দুঃসাহসিক হামলায় ব্রিটিশ বাহিনী সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল।
🕯️ নৃশংস নির্যাতন ও মহীয়সী আত্মত্যাগ
আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত বিশাল ব্রিটিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে কেবল আদিম অস্ত্র নিয়ে বেশিদিন টিকে থাকা সম্ভব ছিল না। ফুলো ও ঝানো মুর্মুর এই দুঃসাহসিক অভিযানের পর ব্রিটিশ সেনারা তাঁদের হন্যে হয়ে খুঁজতে শুরু করে।
অবশেষে তাঁরা ব্রিটিশ বাহিনীর হাতে বন্দি হন। বন্দি হওয়ার পর তাঁদের ওপর নেমে আসে অকথ্য, পাশবিক অত্যাচার। ব্রিটিশ শাসকেরা তাঁদের বীরত্বকে অবদমিত করতে এবং বাকি বিদ্রোহীদের মনে ভয় ধরাতে চরম নিষ্ঠুরতার আশ্রয় নেয়।
অমানুষিক নির্যাতনের পর অত্যন্ত নৃশংসভাবে তাঁদের হত্যা করা হয়।
কোনো কোনো ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী, সিধু-কানহুর ফাঁসির আগেই ফুলো ও ঝানো মুর্মু দেশের জন্য এবং নিজের সমাজের জন্য শহীদ হয়েছিলেন।
🌾 ইতিহাসের পাতায় তাঁদের মূল্যায়ন
দীর্ঘদিন ধরে মূল ধারার ইতিহাসে সিধু-কানহুর নাম যতটা গুরুত্ব পেয়েছে, ফুলো ও ঝানো মুর্মুর বীরত্বগাথা অনেকটাই আড়ালে থেকে গিয়েছিল। তবে বর্তমান সময়ে আদিবাসী সমাজ ও লোকসংস্কৃতির গণ্ডি পেরিয়ে সমগ্র দেশ ও রাজ্যের ইতিহাসে তাঁদের অবদানকে সশ্রদ্ধচিত্তে স্মরণ করা হয়।
উপসংহার: ফুলো ও ঝানো মুর্মু কেবল সাঁওতাল সমাজের নন, বরং সমগ্র ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের আদি নারী বিপ্লবী। ঝাঁসির রানি লক্ষ্মীবাঈ বা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের অনেক আগেই এই দুই আদিবাসী বোন সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলে প্রমাণ করেছিলেন যে, মাতৃভূমি এবং আত্মমর্যাদার রক্ষায় ভারতের নারীরা কতটা ভয়ংকর ও বীরত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
⚠️ তবে কেন এটিকে ইতিহাসের পাতায় সেই মর্যাদা দেওয়া হয়নি?
সাঁওতাল হুল-কে দীর্ঘকাল ধরে ভারতের ‘প্রথম স্বাধীনতা আন্দোলন’ হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি না পাওয়ার পেছনে কিছু ঐতিহাসিক কারণ রয়েছে:
আঞ্চলিক সীমাবদ্ধতা: এই বিদ্রোহ মূলত তৎকালীন অবিভক্ত বাংলা ও বিহারের (বর্তমান ঝাড়খণ্ডসহ) একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে সীমাবদ্ধ ছিল। ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের মতো এটি উত্তর বা মধ্য ভারতে ছড়িয়ে পড়েনি।
ঔপনিবেশিক ইতিহাস চর্চা: তৎকালীন ব্রিটিশ ইতিহাসবিদেরা একে কেবলই একটি ‘আদিবাসী দাঙ্গা’ বা ‘স্থানীয় হাঙ্গামা’ (Rebellion/Riot) হিসেবে তুলে ধরেছিলেন, কোনো রাষ্ট্রীয় বিপ্লব হিসেবে নয়।
শিক্ষিত মধ্যবিত্তের উদাসীনতা: সেই সময়ে কলকাতার তৎকালীন বাবু সমাজ বা শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণী সাঁওতালদের এই সশস্ত্র লড়াইকে সমর্থন করেনি, বরং অনেকেই ব্রিটিশদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।
সংক্ষেপে: ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ যদি ভারতের প্রথম মহাবিদ্রোহ বা জাতীয় স্তরের বিদ্রোহ হয়, তবে ১৮৫৫ সালের সাঁওতাল হুল হলো ভারতের প্রথম সশস্ত্র এবং সুসংগঠিত গণ-স্বাধীনতা আন্দোলন। বীর শহীদ সিধু, কানহু, চাঁদ, ভৈরব, ফুলো ও ঝানো মুর্মুর লড়াই ভারতের বুকে ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতার আসল বীজটি বুনে দিয়েছিল।
