ব্রহ্ম সত্য, জগত মিথ্যা: শঙ্করাচার্যের কালজয়ী দর্শন ও জীবনী
জগতগুরু শ্রীশ্রী শঙ্করাচার্য: বৈশাখ মাসের শুক্লপক্ষের পঞ্চমী তিথিতে এইবছর ২১শে এপ্রিল তাঁর শুভ আবির্ভাব তিথি ।
জন্ম ও প্রারম্ভিক জীবন
শঙ্করাচার্য ৭৮৮ খ্রিস্টাব্দে (ঐতিহ্যগত মতানুসারে) কেরলের কালাডি নামক গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম শিবগুরু এবং মাতার নাম আর্যাম্বা। শৈশবেই পিতার মৃত্যু হলেও, শঙ্করের মধ্যে ছিল অসাধারণ মেধা ও আধ্যাত্মিক তৃষ্ণা। মাত্র আট বছর বয়সেই তিনি বেদ ও শাস্ত্রের পারদর্শিতা অর্জন করেন এবং সন্ন্যাস গ্রহণের ইচ্ছা প্রকাশ করেন। অবশেষে গোবিন্দ ভগবপাদের শিষ্যত্ব গ্রহণ করে তিনি কঠোর ব্রহ্মচর্য ও জ্ঞানচর্চায় নিমগ্ন হন।
অদ্বৈত বেদান্ত দর্শন
শঙ্করাচার্যের প্রধান অবদান হলো ‘অদ্বৈত বেদান্ত’ দর্শনের সুদৃঢ় প্রতিষ্ঠা। তাঁর মতে:
ব্রহ্ম সত্যং জগৎ মিথ্যা জীবো ব্রহ্মৈব নাপরঃ — অর্থাৎ, ব্রহ্মই একমাত্র পরম সত্য, এই দৃশ্যমান জগত মিথ্যা (মায়া দ্বারা আবৃত) এবং জীব ও ব্রহ্মের মধ্যে মৌলিক কোনো পার্থক্য নেই।
তিনি ‘মায়াবাদ’-এর মাধ্যমে ব্যাখ্যা করেছেন যে, অজ্ঞতার কারণে আমরা পরমাত্মা থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন মনে করি। আত্মজ্ঞান বা ব্রহ্মজ্ঞানই হলো মুক্তির একমাত্র পথ।
দেশব্যাপী বিজয় যাত্রা ও মঠ স্থাপন
তৎকালীন সময়ে বৌদ্ধ ও অন্যান্য বৈদিক মতবাদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব নিরসনে শঙ্কর ভারতের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ভ্রমণ করেছেন। তিনি শাস্ত্রীয় তর্কে প্রতিদ্বন্দ্বীদের পরাজিত করে বেদান্তের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেন, যা ‘দিগ্বিজয়’ নামে পরিচিত। তিনি সনাতন ধর্মকে সুসংহত করার লক্ষ্যে ভারতের চার কোণে চারটি প্রধান মঠ প্রতিষ্ঠা করেন: ১. শৃঙ্গেরি মঠ (দক্ষিণ) — কর্ণাটক ২. দ্বারকা মঠ (পশ্চিম) — গুজরাট ৩. গোবর্ধন মঠ (পূর্ব) — ওড়িশা (পুরী) ৪. জ্যোতির্মঠ (উত্তর) — উত্তরাখণ্ড
সাহিত্যিক অবদান
শঙ্করাচার্যের পাণ্ডিত্য ছিল বহুমুখী। তিনি উপনিষদ, ব্রহ্মসূত্র এবং ভগবদ্গীতার উপর অসামান্য ভাষ্য (ভাষ্যগ্রন্থ) রচনা করেছেন। এছাড়াও তিনি অসংখ্য স্তোত্র ও কাব্য রচনা করেছেন, যার মধ্যে ‘ভজগোবিন্দম’, ‘বিবেকচূড়ামণি’, এবং ‘সৌন্দর্যলহরী’ উল্লেখযোগ্য। তাঁর ভাষা অত্যন্ত সহজ অথচ গভীর দার্শনিক ভাবনার বাহক।
তাঁর দর্শনের মূল ভিত্তি এবং একটি অতি জনপ্রিয় স্তোত্র নিচে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো:
১. অদ্বৈত দর্শনের তিনটি স্তর
শঙ্করাচার্য জগতকে বোঝার জন্য তিনটি স্তরের কথা বলেছেন, যা দিয়ে তিনি 'জগত মিথ্যা' কথাটি ব্যাখ্যা করেছেন:
প্রতিভাসিক সত্য: যা কেবল স্বপ্নে বা ভ্রমের সময় সত্য মনে হয় (যেমন স্বপ্নে বাঘ দেখা)।
ব্যবহারিক সত্য: আমরা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে যা অনুভব করি—এই পৃথিবী, সমাজ, শরীর। যতক্ষণ আমাদের আত্মজ্ঞান না হচ্ছে, ততক্ষণ এটিই আমাদের কাছে সত্য।
পারমার্থিক সত্য: পরম সত্য বা ব্রহ্ম। এই জ্ঞান লাভ করলে বোঝা যায় যে জগত এবং ব্রহ্ম আলাদা কিছু নয়।
২. একটি কালজয়ী স্তোত্র: "নির্বাণষটকম"
শঙ্করাচার্য যখন ছোটবেলায় তাঁর গুরু গোবিন্দ ভগবপাদের সাথে প্রথম সাক্ষাৎ করেন, গুরু তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, "তুমি কে?" তখন বালক শঙ্কর উত্তরের পরিবর্তে ৬টি শ্লোক পাঠ করেছিলেন, যা আজ 'নির্বাণষটকম' নামে বিশ্বখ্যাত। এর একটি বিশেষ অংশ হলো:
মনোবুদ্ধ্যহঙ্কার চিত্তানি নাহং ন চ শ্রোত্রজিহ্বে ন চ ঘ্রাণনেত্রে। ন চ ব্যোম ভূমির্ন তেজো ন বায়ুশ্চিদানন্দ রূপঃ শিবোহং শিবোহং॥
সহজ অর্থ: আমি মন নই, বুদ্ধি নই, অহংকার বা চিত্তও নই। আমি কান, জিভ, নাক বা চোখ নই। আমি আকাশ, পৃথিবী, আগুন বা বাতাসও নই। আমি কেবল শুদ্ধ আনন্দময় চেতনা; আমিই শিব, আমিই শিব।
৩. তাঁর স্তোত্রের বিশেষত্ব
শঙ্করাচার্য কেবল জটিল তত্ত্ব দিয়েই থেমে থাকেননি। তিনি সাধারণ মানুষের ভক্তির জন্য অনেক সহজ স্তোত্র লিখেছেন। তাঁর মতে, জ্ঞানের পথে পৌঁছাতে গেলে চিত্ত শুদ্ধ করা প্রয়োজন, আর তার জন্য 'ভক্তি' হলো শ্রেষ্ঠ মাধ্যম। এজন্যই তিনি 'ভজ গোবিন্দম্' স্তোত্রে বারবার নাম জপ করার উপদেশ দিয়েছেন।
শ্রীশ্রী শঙ্করাচার্য ও বুদ্ধদেব: অবতারত্বের স্বীকৃতি
অনেকে মনে করেন শঙ্করাচার্য বোধহয় বৌদ্ধধর্মের বিরোধী ছিলেন, কিন্তু বিষয়টি আসলে কিছুটা ভিন্ন। তিনি বৌদ্ধধর্মের 'শূন্যবাদ' দর্শনের পরিবর্তে উপনিষদের 'ব্রহ্মবাদ' প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু ভগবান বুদ্ধের প্রতি তাঁর অগাধ শ্রদ্ধা ছিল।
দশাবতার স্তোত্র: শঙ্করাচার্য তাঁর রচিত বিভিন্ন স্তোত্রে ভগবান বুদ্ধকে বিষ্ণুর নবম অবতার হিসেবে বন্দনা করেছেন। তাঁর মতে, বুদ্ধদেব অহিংসা ও করুণার মূর্ত প্রতীক হয়ে জগতে আবির্ভূত হয়েছিলেন।
বৌদ্ধ দর্শনের সাথে মিল: শঙ্করাচার্যের অদ্বৈত বেদান্ত দর্শনের সাথে বৌদ্ধ দর্শনের এতই মিল ছিল যে, তৎকালীন অনেক পণ্ডিত তাঁকে 'প্রচ্ছন্ন বৌদ্ধ' (ছদ্মবেশী বৌদ্ধ) বলেও অভিহিত করতেন। শঙ্কর বুদ্ধদেবের ত্যাগ ও নির্বাণের ধারণাকে বৈদিক ঐতিহ্যের সাথে পুনরায় যুক্ত করেছিলেন।
সমন্বয় সাধন: তিনি বুদ্ধদেবকে অবতার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমে সনাতন ধর্মের সাথে বৌদ্ধধর্মের যে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল, তা কমিয়ে একটি বৃহৎ সমন্বয় গড়ে তোলেন। তিনি বুদ্ধদেবকে হিন্দুধর্মের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে সাধারণ মানুষের মনে তাঁর পবিত্রতা সুদৃঢ় করেন।
বৌদ্ধধর্ম ও শঙ্করাচার্য: "শঙ্করাচার্য কেবল বেদান্তের প্রচারই করেননি, তিনি তৎকালীন ভারতের বিভিন্ন ধর্মীয় মতবাদের মধ্যে এক অপূর্ব সমন্বয় সাধন করেছিলেন। তিনি ভগবান বুদ্ধকে শ্রীবিষ্ণুর নবম অবতার হিসেবে স্বীকার করে তাঁর স্তুতি গেয়েছেন। বুদ্ধদেবের প্রচারিত অহিংসা ও করুণার বাণীকে তিনি বৈদিক দর্শনের আত্মজ্ঞানের সাথে মিলিয়ে দিয়েছিলেন। তাঁর এই উদার দৃষ্টিভঙ্গি বৌদ্ধ ও হিন্দুধর্মের মধ্যকার সংঘাত কমিয়ে ভারতীয় সংস্কৃতিতে এক অখণ্ড আধ্যাত্মিক চেতনার জন্ম দেয়।"
ইতিহাসে তাঁকে 'আদি' বলা হয় কেন ?
পার্থক্য বজায় রাখা: পরবর্তীতে তাঁর প্রতিষ্ঠিত চারটি মঠের প্রধানদেরও 'শঙ্করাচার্য' উপাধিতে ভূষিত করা হয়। তাই মূল প্রবর্তক এবং বর্তমান বা পরবর্তী মঠাধিপতিদের মধ্যে পার্থক্য বোঝাতে তাঁকে 'আদি' শঙ্করাচার্য বলা হয়।
পুনঃপ্রতিষ্ঠাতা: তিনি যে সময় আবির্ভূত হয়েছিলেন, তখন বৈদিক ধর্ম অনেকটা ম্লান হয়ে গিয়েছিল। তিনি নতুন করে বেদান্ত দর্শনের পুনর্জাগরণ ঘটান বলেই তাঁকে এই মতবাদের আদি পুরুষ বা মূল স্থপতি মনে করা হয়।
উপসংহার
শ্রীশ্রী শঙ্করাচার্য কেবল একজন দার্শনিক ছিলেন না, তিনি ছিলেন ভারতের সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক ঐক্যের প্রতীক। তিনি হিন্দুধর্মের বিভিন্ন শাখার মধ্যে সমন্বয় সাধন করেছিলেন (পঞ্চায়তন পূজা প্রবর্তন করে)। আজ এক হাজার বছরেরও বেশি সময় পরেও তাঁর দর্শন এবং শিক্ষাবলী মানবজাতিকে আলোর পথ দেখায়। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন যে, পরম সত্যের অনুসন্ধানই জীবনের মূল লক্ষ্য এবং আত্মজ্ঞানই প্রকৃত স্বাধীনতা।
