করম পূজা কি ? এই পূজার ইতিহাস কি ? ( আজ সরকারী ছুটি )
করম পূজা কি?
করম পূজা মূলত ভারতের ঝাড়খণ্ড, ছত্তিশগড়, বিহার, মধ্যপ্রদেশ, পশ্চিমবঙ্গের আদিবাসী সম্প্রদায় (বিশেষ করে সাঁওতাল, মুণ্ডা, ওরাঁও প্রভৃতি) এবং গ্রামীণ মানুষদের একটি ঐতিহ্যবাহী উৎসব। এটি কৃষিভিত্তিক ও প্রাকৃতিক দেবতার পূজা। সাধারণভাবে বলা যায়—
করম গাছ (কদম গাছ নামেও পরিচিত) এই পূজার প্রধান প্রতীক।
ভ্রাতৃত্ব, ভালোবাসা, দাম্পত্য সুখ, ফসলের প্রাচুর্য ও সমাজে শান্তি কামনার জন্য করম দেবতার পূজা করা হয়।
বিশেষ করে অবিবাহিতা মেয়েরা এই পূজায় অংশ নেয়, যাতে তাদের ভাইদের মঙ্গল, দীর্ঘায়ু ও সমৃদ্ধি হয়।
করম গাছের একটি শাখা কেটে এনে গ্রামের মাঝখানে বা উঠোনে স্থাপন করা হয় এবং তার চারপাশে গান, নাচ, ঢোল বাজনা হয়।
📌 সময়: ভাদ্র মাসের একাদশী তিথিতে (আগস্ট–সেপ্টেম্বর মাসে) এই পূজা পালন করা হয়।
📌 আচার:
মাটির পাত্রে ধান/গম ভিজিয়ে চারা গজানো হয় (যাকে "জাওয়া" বলা হয়)।
করম গাছের ডাল এনে পুঁতে দেওয়া হয়।
গ্রামের তরুণী ও মহিলারা উপবাস থেকে গান-নাচ করে, করম দেবতার কাহিনি শোনে।
শেষে পূজা শেষে করম দেবতার গল্প শোনার পর সবাই মিলে প্রসাদ খায়।
👉 মূলত করম পূজা হল প্রকৃতি, ফসল ও ভ্রাতৃস্নেহের উৎসব, যা প্রাচীনকাল থেকে আদিবাসী সমাজের মধ্যে চলে আসছে।
🌿 করম পূজার কাহিনি
অনেক বছর আগে এক গ্রামে সাত ভাই থাকত। তাদের ঘরে এক বোনও ছিল। সে অত্যন্ত সুন্দরী এবং গৃহস্থালির কাজেও পারদর্শী ছিল। ভাইয়েরা চাষবাস করে সংসার চালাত।
একদিন তারা মাঠে কাজে গেল আর বোন রান্না করে অপেক্ষা করছিল। ঠিক সেই সময় একদল অতিথি এসে পড়ল। বোন তাদের খাওয়াল, যত্ন করল। অতিথিরা চলে যাওয়ার পর রান্না ফুরিয়ে গেল। ফলে ভাইরা ফিরে এসে খাওয়ার কিছু পেল না।
ক্ষুধায় কাতর ভাইয়েরা রাগ করে নিজেদের বোনকে অভিশাপ দিল এবং করম দেবতাকে তুষ্ট করতে গিয়ে তাকে ঘর থেকে তাড়িয়ে দিল।
বোন দুঃখে কান্না করতে করতে বনে চলে গেল। সেখানে করম গাছের নিচে বসে সে উপবাস করল এবং করম দেবতার আরাধনা করল। দেবতা তার ভক্তি দেখে খুশি হয়ে তাকে আশীর্বাদ করলেন।
পরদিন ভাইয়েরা যখন বোনকে খুঁজতে বের হল, তখন তারা বোনকে করম দেবতার কৃপায় আবার সুস্থ ও উজ্জ্বল রূপে ফিরে পেল। এরপর থেকে ভাইয়েরা বুঝল যে, বোনের মঙ্গল আর সংসারের শান্তি করম দেবতার কৃপায়ই সম্ভব।
তখন থেকে প্রতি বছর ভাদ্র মাসের একাদশীতে করম গাছের শাখা এনে তার পূজা করা হয় এবং ভাইয়ের মঙ্গল, ফসলের প্রাচুর্য, সংসারের সুখ-শান্তির জন্য প্রার্থনা করা হয়।
কোন দেবতার উপাসনা করা হয় ?
এই উৎসবে করম দেবতার উপাসনা করা হয়। করম পূজা উৎসব ভাদ্র মাসের শুক্ল একাদশী তিথিতে পালিত হয়। এর সাত দিন আগে মেয়েরা ভোরবেলায় শালের দাঁতন কাঠি ভেঙে নদী বা পুকুরে স্নান করে এবং বাঁশ ও ডাল দিয়ে বোনা ছোট টুপা ও ডালায় বালি দিয়ে ভর্তি করে। তারপর সে ডালাগুলিকে গ্রামের প্রান্তে একটা জায়গায় রাখে এবং জাওয়া গান গাইতে গাইতে তিন পাক ঘোরে। এরপর তাতে তেল ও হলুদ দিয়ে মটর, মুগ, বুট, জুনার ও কুত্থির বীজ মাখানো হয়। অবিবাহিত মেয়েরা স্নান করে ভিজে কাপড়ে ছোট শাল পাতার থালায় বীজগুলিকে বুনা দেন ও তাতে সিঁদুর ও কাজলের তিনটি দাগ টানা হয়, যাকে বাগাল জাওয়া বলা হয়। এরপর ডালাতে ও টুপাতে বীজ বোনা হয়। এরপর প্রত্যেকের জাওয়া চিহ্নিত করার জন্য কাশকাঠি পুঁতে দেওয়া হয়। একে জাওয়া পাতা বলা হয়।
যে ডালায় একাধিক বীজ পোঁতা হয়, তাকে সাঙ্গী জাওয়া ডালা এবং যে ডালায় একটি বীজ পোঁতা হয়, তাকে একাঙ্গী জাওয়া ডালা বলা হয়। যে সমস্ত কুমারী মেয়েরা এই কাজ করেন, তাদের জাওয়ার মা বলা হয়। বাগাল জাওয়াগুলিকে লুকিয়ে রেখে টুপা ও ডালার জাওয়াগুলিকে নিয়ে তারা গ্রামে ফিরে আসেন। দিনের স্নান সেরে পাঁচটি ঝিঙাপাতা উলটো করে বিছিয়ে প্রতি পাতায় একটি দাঁতনকাঠি রাখা হয়।
পরদিন গোবর দিয়ে পরিষ্কার করে আলপনা দেওয়া হয় ও দেওয়ালে সিঁদুরের দাগ দিয়ে কাজলের ফোঁটা দেওয়া হয়। পুরুষেরা শাল গাছের ডাল বা ছাতাডাল সংগ্রহ করে আনেন। গ্রামের বয়স্কদের একটি নির্দিষ্ট করা স্থানে দুইটি করম ডাল এনে পুঁতে রাখা হয়, যা সন্ধ্যার পরে করম ঠাকুর বা করম গোঁলায় এবং ধরম ঠাকুর হিসেবে পূজিত হন। কুমারী মেয়েরা সারাদিন উপোষ করে সন্ধ্যার পরে থালায় ফুল, ফল সহকারে নৈবেদ্য সাজিয়ে এই স্থানে গিয়ে পূজা করেন।
এরপর সারারাত ধরে নাচ গান চলে। পরদিন সকালে মেয়েরা জাওয়া থেকে অঙ্কুরিত বীজগুলিকে উপড়ে নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নিয়ে বাড়িতে বিভিন্ন স্থানে সেগুলিকে ছড়িয়ে দেন। এরপর করম ডালটিকে জলে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। পূজার পরে মেয়েরা পরস্পরকে করমডোর বা রাখী পরিয়ে দেয়। এই করমসখীরা, কর্মস্থলে একে অপরকে রক্ষা করে। জঙ্গলে পাখির ডাকের নকলে ‘করমড্যের’ ডেকে বিপদ জানায়।
করম গান ও নাচ
এই পরবের মূল সম্পদ হল জাওয়া-গান। এই গানগুলোর কোনো লিখিত রূপ না পাওয়া গেলেও প্রতিটি গ্রামে বংশ পরম্পরায় মুখে মুখে প্রচলিত। এই গানগুলো র মাধ্যমে নারী মনের সূক্ষ্ম অনুভূতির পরিচয় পাওয়া যায়। এই গানের সাথে সাথে চলে করম নাচ। জাওয়াকে কেন্দ্র করে মেয়েরা চক্রাকারে নাচে। এই নাচ গানের মধ্যে দিয়ে প্রতিফলিত হয় তাদের দৈনন্দিন জীবনের হাসি-কান্না,সুখ-দুঃখ। এই গানগুলো বাংলার লোকসাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদও বলা যেতে পারে।
পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার এই দিনে অর্থাৎ ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ , বুধবার সারা রাজ্যে ছুটি ঘোষণা করেছেন । সরকারী স্কুল , সরকারী অফিস ছুটি থাকবে । অর্ডার কপি এখান থেকে ডাউনলোড করতে পারবেন ➡️ ডাউনলোড
